
ডিপফেক কি তাহলে নতুন সন্দেহের ফাঁদ? ডঃ তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব, এবং দাউদ ইব্রাহিম হাসান
আজকের দিনে, সত্য আর মিথ্যার সীমান্তরেখা মুছে যেতে বসেছে। আমরা এমন এক সময়ের দ্বারপ্রান্তে, যেখানে চোখ যা দেখে, কান যা শোনে-তাও বিশ্বাস করা কঠিন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-চালিত ‘ডিপফেক’ (Deepfake) প্রযুক্তি যেন এক ডিজিটাল মুখোশ, যা দিয়ে কুচক্রী মহল ভুয়া খবরের বিষাক্ত ছোবল হানছে আমাদের সমাজের গভীরতম স্তরে। এই প্রযুক্তি কেবল মানুষকে বিভ্রান্ত করছে না, এটি ভেঙে দিচ্ছে আস্থা, নৈতিকতা এবং সবচেয়ে বড় কথা-আমাদের আইনের প্রতি বিশ্বাস। বাংলাদেশে এই অভিশাপের প্রভাব এখন আর ভবিষ্যতের কল্পনা নয়; এটি আমাদের বর্তমানের এক তিক্ত বাস্তবতা।
২০১৫ সালে যখন বাংলাদেশ ডিজিটাল বিপ্লবের স্বপ্ন দেখছিল, তখন কেউ ভাবেনি, এই প্রযুক্তিই একদিন আমাদের স্বপ্নকে গ্রাস করবে। সেই সময় থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ডিপফেক প্রযুক্তির ব্যবহার যেন এক নীরব ভূমিকম্প ঘটিয়ে চলেছে। সাইবার সিকিউরিটি বিশ্লেষকদের মতে, ডিপফেক টুলের ব্যবহার ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ৪ গুণ বেড়েছে, যা প্রমাণ করে মিথ্যা ছড়ানোর পথ কত সহজ হয়েছে। গুগল ট্রেন্ডসের ডেটা দেখায়, ২০১৫ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে ডিপফেক সম্পর্কিত সার্চ ভলিউম ৬০০% বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সহজলভ্যতা জন্ম দিয়েছে অপপ্রচারের সহজলভ্যতার, যা সত্যের ভিত্তিকে নড়িয়ে দিয়েছে।
বিশেষ করে রাজনৈতিক অঙ্গনে এর প্রভাব ভয়াবহ। একটি বেসরকারি জরিপ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে ভুয়া ভিডিওর প্রভাব নিয়ে ৫৫% ভোটার উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। নির্বাচন কমিশনের পর্যবেক্ষণ মতে, ভুয়া ভিডিও তৈরি করে জনমত প্রভাবিত করা এখন এক নিয়মিত কৌশল হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে নির্মম আঘাতটি আসে নারীর জীবনে। বাংলাদেশ সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশন (CCAF) মতে, সাইবার হয়রানির শিকার নারীদের মধ্যে প্রায় ৪২% ডিপফেক বা বিকৃতির শিকার। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের গবেষণায় দেখা যায়, এই ভুক্তভোগীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা ১৯% বেশি।
আর্থিক জালিয়াতিতেও এর ব্যবহার বাড়ছে। পুলিশের সাইবার ইউনিট জানিয়েছে, ২০২৩-২৪ সালে আর্থিক ডিপফেক জালিয়াতির ঘটনা প্রায় ৩ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেনসিক বিভাগ বলছে, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ভুয়া ভয়েস বা ভিডিও ব্যবহার করে সংঘটিত লেনদেনে ক্ষতির পরিমাণ বার্ষিক ২ বিলিয়ন টাকা ছাড়িয়ে গেছে। সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত ৫ বছরে সামাজিক অস্থিরতার ২০% এর পেছনে ডিপফেক বা ভুয়া কনটেন্টের ভূমিকা ছিল, যা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে সাম্প্রদায়িক উসকানি ছড়াচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, কোভিড-১৯ মহামারীর সময় ভুয়া তথ্যের কারণে প্রায় ১৫% মানুষ ভুল চিকিৎসা নিয়েছেন।
ডিপফেক-এর এই আগ্রাসন মোকাবিলার জন্য আমাদের হাতে যে আইনি অস্ত্র আছে, তা যেন ভোঁতা। আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিদ্যমান ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (DSA) বা অন্যান্য আইন ডিপফেককে সরাসরি সংজ্ঞায়িত করেনি, ফলে এর অধীনে ডিপফেক মামলার নিষ্পত্তি হার ২০% এর কম। আইন ও বিচার বিভাগের তথ্য অনুসারে, ডিজিটাল মামলার নিষ্পত্তি হতে গড়ে ২-৩ বছর সময় লাগে, এবং এই দীর্ঘসূত্রিতার কারণে ৬৭% ভুক্তভোগী আইনি প্রক্রিয়ায় আগ্রহ হারান।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রশিক্ষণেও রয়েছে বড় ঘাটতি। পুলিশের সাইবার টিমের মধ্যে মাত্র ১০% এর AI-ভিত্তিক ফরেনসিক প্রশিক্ষণে অ্যাক্সেস আছে, ফলে ডিপফেক কনটেন্ট শনাক্তকরণের জন্য আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সীমিত। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ৮০% সদস্যের ডিপফেক বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ নেই। বিচারপতিদের এক পর্যবেক্ষণে জানা যায়, বিশেষজ্ঞ সাক্ষ্য ছাড়াই ৫০% মামলায় প্রযুক্তিগত জটিলতা থেকে যায়। রাজনীতিবিদ বা উচ্চপদস্থ ব্যক্তির সম্পর্কিত ৮৫% ডিপফেক ঘটনা আইনি প্রক্রিয়ায় ধীর গতি পায়, যা বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি করে। সিএসআর (CSR) প্রতিবেদন বলছে, নারী হয়রানির ডিপফেক ঘটনায় মাত্র ১৫% ভুক্তভোগী প্রকাশ্যে আইনি সাহায্য চান। বিটিআরসি, আইসিটি বিভাগ ও পুলিশের মধ্যে ডিপফেক সংক্রান্ত তথ্য বিনিময়ের সময় গড়ে ৪৮ ঘণ্টা লাগে।
ডিপফেক কেবল সামাজিক ও আইনি সমস্যা নয়, এর অর্থনৈতিক ও মানসিক প্রভাবও সুদূরপ্রসারী। সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের মতে, ২০২৩ সালে শেয়ারবাজারে ডিপফেক গুজবের কারণে ক্ষতি প্রায় ৩%, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট করছে। এফবিসিসিআই (FBCCI) এর এক জরিপ অনুযায়ী, ২৫% ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ডিপফেক দ্বারা সুনাম ক্ষতির শিকার হয়েছে। মানবাধিকার কমিশনের তথ্য মতে, ডিপফেক ভুক্তভোগীদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ট্রমা ও পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (PTSD) এর লক্ষণ দেখা যায় ৬০% এর বেশি। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ডিপফেক টুলের মাধ্যমে অন্যের কাজ নকল করার প্রবণতা ১০% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যকে নষ্ট করছে। বিবিএস (BBS) এর শ্রমশক্তি জরিপ অনুসারে, ডিপফেক জনিত হয়রানির কারণে কর্মজীবী নারীদের কর্মক্ষেত্র ত্যাগের হার ২০% বেড়েছে।
যদি ডিপফেক-এর বিষাক্ত ছোবল এবং আইনি দুর্বলতা দ্রুত সমাধান না করা হয়, তবে ২০২৫ থেকে ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এক ভয়াবহ বিপর্যয় নামতে পারে।
বছর: মূল সমস্যা/ক্ষেত্র: নেতিবাচক প্রভাব (শতকরা হার): ব্যাখ্যা ও বাস্তবিকতা :
২০২৫: গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া: রাজনৈতিক মিথ্যা তথ্যের কারণে নির্বাচনী সততায় ২০% অবিশ্বাস। ভুয়া জনমত সৃষ্টি করে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়বে।
২০৩০: সামাজিক অস্থিরতা: ডিপফেক-এর মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের ঘটনা ৫০% বৃদ্ধি। ধর্মীয় ও জাতিগত বিদ্বেষ ছড়িয়ে সমাজে বড় ধরনের সংঘাত তৈরি হতে পারে।
২০৩৫: বিচার ব্যবস্থার জটিলতা: ডিপফেক মামলায় আইনি জটিলতার কারণে মামলা নিষ্পত্তির হার ৪০% হ্রাস।প্রমাণ যাচাইয়ে দুর্বলতার কারণে বিচার ব্যবস্থা নিজেই অকার্যকর হয়ে পড়বে।
২০৪০: অর্থনৈতিক ক্ষতি:ডিপফেক জালিয়াতি ও গুজব দ্বারা দেশের মোট অর্থনৈতিক ক্ষতি ২% এর বেশি হবে। শেয়ারবাজার, লেনদেন ও বৈদেশিক বিনিয়োগে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
২০৪৫ (অনুমান): গণমাধ্যমের বিলুপ্তি: ভুয়া খবরের কারণে মূলধারার মিডিয়ার প্রতি আস্থা ৮০% হ্রাস। মানুষ সত্যের উৎস খুঁজে পাবে না, যা গণতন্ত্রের জন্য মারাত্মক।
২০৫০ (অনুমান):সাইবার ক্রাইম বৃদ্ধি: মোট সাইবার ক্রাইম ঘটনায় ডিপফেকের অংশ ৪৫% হবে। AI প্রযুক্তির অপব্যবহার অভিশাপে পরিণত হবে।
জাতিসংঘের সাইবার নিরাপত্তা পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সাল নাগাদ ডিপফেক দ্বারা সৃষ্ট বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ৩০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে, যার একটি বড় অংশ বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতিতে পড়বে। ২০৪০ সালে ভুয়া খবর ও গুজব দ্বারা দেশের মোট অর্থনৈতিক ক্ষতি ২% এর বেশি হবে। বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (BIDA) এর মতে, ডিপফেক গুজবের কারণে বৈদেশিক বিনিয়োগে বার্ষিক ৫% নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ২০৫০ সাল নাগাদ মোট সাইবার ক্রাইম ঘটনায় ডিপফেকের অংশ ৪৫% হতে পারে।
এই ভয়াবহ চিত্র আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, কেবল আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; তার দ্রুত ও কার্যকর প্রয়োগ প্রয়োজন। ২০২৫ সালের মধ্যে সাইবার ফরেনসিক ইউনিটগুলোর সক্ষমতা কমপক্ষে ৫০% বাড়াতে হবে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রতিটি সদস্যকে ডিপফেক শনাক্তকরণের বিশেষ প্রশিক্ষণ দিতে হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে ডিপফেক সংক্রান্ত অভিযোগ নিষ্পত্তির সময় ১ বছরের মধ্যে নামিয়ে আনতে হবে। আমাদের সমাজকে বুঝতে হবে, ডিজিটাল সাক্ষরতা এখন একটি জীবনরক্ষাকারী ঢাল। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৫ সাল থেকে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ডিপফেক শনাক্তকরণ (Deepfake Detection) বাধ্যতামূলক করা দরকার। এই চ্যালেঞ্জকে উপেক্ষা করা মানে জাতির আত্মাকে ডিজিটাল কারাগারে বন্দি করা।
হে জাতি! তোমার প্রযুক্তি যখন মুখোশ পরে আসে, তখন বিশ্বাস করো না তোমার চোখকে! মিথ্যা ও ছলনার ডিজিটাল জাল ছিন্ন করো! জাগো, তোমার ঐক্য, তোমার জ্ঞান, আর তোমার ন্যায়বিচারের দৃঢ় কণ্ঠস্বরই হবে ডিপফেক-এর বিরুদ্ধে তোমার চূড়ান্ত স্বাধীনতা!



