
উত্তরের জেলা কুড়িগ্রাম। নদ-নদী, চর আর জলাভূমির এক অপার সৌন্দর্যের জনপদ। নদীর সঙ্গে এখানকার মানুষের সম্পর্ক যেন একই সুতোয় গাঁথা। বর্ষায় নদীর পানি যখন চারপাশ ছাপিয়ে যায়, তখন বদলে যায় এখানকার প্রকৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রার চিত্র। গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ এবং কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী অঞ্চলের মধ্যে সংযোগকারী তিস্তা নদীর উপর নির্মিত মওলানা ভাসানী সেতু (তৃতীয় তিস্তা সেতু) সংলগ্ন এলাকা থেকে এমনই এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য ধারণ করেছেন আমাদের প্রতিনিধি ফিরোজ কবির।
দিগন্তজোড়া জলরাশি। স্বচ্ছ নীল আকাশের নিচে পানিতে ভাসছে সবুজের ছোঁয়া। মাঝে ছোট্ট একটি বসতি, চারপাশে পানি, অথচ থেমে নেই জীবন। বর্ষার পানিতে নিমজ্জিত বিস্তীর্ণ জনপদ যেন হয়ে ওঠে এক বিশাল জলচিত্র। পানির বুক চিরে জেগে থাকা সবুজ আর ঘরবাড়িগুলো মনে করিয়ে দেয় নদী এখানে শুধু প্রকৃতির অংশ নয়, মানুষের জীবন ও জীবিকারও অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী। কুড়িগ্রামকে বলা যায় নদীর দেশ আবার এ জেলার একটি স্লোগান রয়েছে “ভাওয়াইয়া গানের ধাম, নদ-নদীময় কুড়িগ্রাম” । ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা, দুধকুমারসহ ১৬টি নদ-নদী এ জেলার প্রকৃতি ও জনজীবনকে প্রতিনিয়ত নতুন রূপ দেয়। নদীর গতিপথ বদলায়, জেগে ওঠে চর। আবার কখনো ভাঙনে বিলীন হয় বসতভিটা ও ফসলের মাঠ। তবুও নদীকে ঘিরেই কুড়িগ্রামের মানুষের স্বপ্ন, সংগ্রাম আর বেঁচে থাকার গল্প। চিলমারীও সেই নদীমাতৃক ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গে এ জনপদের সম্পর্ক বহু পুরোনো। নদীর ঘাট, নৌকা, চরাঞ্চলের জীবন আর বর্ষার জল সব মিলিয়ে চিলমারীর নিজস্ব একটি নদীকেন্দ্রিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। এই জলময় ভূপ্রকৃতিই কুড়িগ্রামকে দিয়েছে তার স্বতন্ত্র পরিচয়।
আমাদের চোখে এই দৃশ্য হয়তো শুধু একটি সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য। কিন্তু এখানকার মানুষের কাছে এই পানি জীবনের বাস্তবতা। নদী আর জলকে সঙ্গে নিয়েই তাদের বসবাস, কৃষিকাজ ও জীবিকা। আর সেই জীবনসংগ্রামের মধ্যেও কুড়িগ্রামের প্রকৃতি তার নিজস্ব সৌন্দর্য ধরে রেখেছে। নীল আকাশের নিচে শান্ত জলরাশি, পানির মাঝে সবুজের বিস্তার আর ছোট্ট ছোট্ট বসতি। এ যেন নদী আর মানুষের সহাবস্থানের এক জীবন্ত ছবি। কুড়িগ্রামের নদ-নদী শুধু এ জেলার ভূগোল তৈরি করেনি, তৈরি করেছে মানুষের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীবনধারাও। নদী বাঁচলে বাঁচবে এই জনপদের প্রকৃতি, ঐতিহ্য আর মানুষের জীবন। নদীময় কুড়িগ্রাম তাই শুধু একটি জেলা নয়। এ এক জল, মাটি আর মানুষের গল্প।
Leave a Reply