1. online@69bd.tv : বার্তা বিভাগ : বার্তা বিভাগ
  2. admin@69bd.tv : admin :
বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩১ পূর্বাহ্ন

এলাও চাকরি হয় নাই’ বরের উপাখ্যান

লেখক -শিক্ষাবিদ ও সাংবাদিক, শফিকুল ইসলাম বেবু
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৬
  • ২৫ বার পঠিত

কুড়িগ্রামের এই সাঁঝবেলায় আকাশটার রঙ কী অদ্ভুতভাবে বদলে যায়! ধরলা নদীর বুক চিরে যে বাতাসটা ধেয়ে আসে, তাতে ভিজে মাটির এক ধরনের মাতাল করা সুবাস থাকে। বারান্দার মোড়ায় বসে আছি, হাতে চায়ের কাপ। লিকারটা আজ একটু বেশিই কড়া হয়েছে—গাঢ় লালচে রঙ থেকে অল্প অল্প ধোঁয়া উঠছে। বৃষ্টির শুরুটা হয়েছিল টিপটিপ করে, এখন চালের ওপর টিনের ঝমঝম শব্দটা বেশ জমকালো রূপ নিয়েছে।

​হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকলে হয়তো তাঁর কোনো উপন্যাসের শুরুতে এমন দৃশ্য দেখে লিখতেন—“সব মানুষই জীবনে অন্তত একবার নিজের অজান্তে কোনো বিষাদঘন কৌতুকাবহ নাটকের প্রধান চরিত্র হয়ে যায়। বাকি জীবন সে শুধু সেই নাটকের সংলাপগুলো মনে করে একা একা হাসে, আবার কখনো চুপচাপ চোখ মোছে।”
​আমার জীবনের সেই নাটকের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া সংলাপটি ছিল মাত্র চারটি শব্দের—‘এলাও চাকরি হয় নাই!’
​ঘটনাটা খুব আগের বলা যাবে না, আবার একেবারে টাটকাও নয়। পাত্রের নাম মতি—আমার এক অতি পরিচিত, স্নেহভাজন ছোট ভাই। গায়ের রঙ কিছুটা তামাটে, হাড় জিরজিরে শরীর, আর চোখে বিশালাকার চশমা। দেখতে ঠিক সেই জ্যামিতি শিক্ষকের মতো, যিনি ক্লাসে ঢুকে বোর্ডে নিখুঁত বৃত্ত এঁকে গম্ভীর গলায় বলতেন, “বৃত্তের ভালোবাসা আর পৃথিবীর মায়া—দুই-ই সমান। কোনোটারই শেষ নাই, কিন্তু কেন্দ্রবিন্দু না থাকলে পুরোটাই শূন্য।”
​মতি একটি বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে গণিত পড়াত। দিনরাত হাড়ভাঙা খাটুনি, শিক্ষার্থীদের পেছনে ঢেলে দেওয়া অফুরন্ত প্রাণশক্তি—কিন্তু মাস শেষে পকেটে যা আসত, তা দিয়ে একটা ভালো সাইকেলের টায়ার বদলাতেও তাকে দশবার পকেটের দিকে তাকাতে হতো। অথচ স্কুলের পোলাপান আর অভিভাবকদের কাছে মতি ছিল যেন এক জাদুকরের নাম।
​তা সেই মতির বিয়ের কথাবার্তা পাকা হলো। উলিপুরের এক প্রত্যন্ত গাঁয়ে কনে দেখা। বরযাত্রী যাওয়ার আগের দিন মতি আমার ঘরে এসে কাচুমাচু মুখে দাঁড়িয়ে রইল। পকেট থেকে রুমাল বের করে চশমাটা মুছতে মুছতে বলল, “ভাইজান, বরযাত্রী হিসেবে আপনাকে যাইতেই হবে। আপনি না গেলে আমার এই ভাঙা কপালটার বিয়েটাই কেমন যেন অসম্পূর্ণ থাইকা যাবে।” আমি আর না করতে পারলাম না।
​বিয়ের দিন বিকেলে কাঁচা মাটির স্যাঁতসেঁতে রাস্তা ধরে যখন আমাদের বরযাত্রীর দল কনেবাড়ি পৌঁছাল, তখন হালকা টিপটিপ বৃষ্টি শুরু হয়েছে। টিনের চালে টুপটুপ জল পড়ার একঘেয়ে ছন্দ। বরের সাজে পাঞ্জাবি-পাজামা পরা মতিকে কেমন যেন খানিকটা অপরাধীর মতো দেখাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, বেসরকারি স্কুলে চাকরি করাটা তার জীবনের এক বিরাট সামাজিক অপরাধ, আর বর সেজে সে যেন সেই অপরাধের বোঝা ঢাকার এক ব্যর্থ চেষ্টা করছে!
​কনেবাড়ির উঠোন পেরিয়ে মোড়া পাতা একটা বড় ঘরে আমাদের বসতে দেওয়া হলো। চারদিকে তখন গরম খিচুড়ি আর খাসির মাংসের সুবাস ছড়াচ্ছে। এমন সময় দরজার পর্দা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন এক বৃদ্ধা। কনের নানী। বয়স সত্তরের উপরে, কিন্তু চোখের দৃষ্টি প্রদীপের শিখার মতো ধারালো ও সজাগ। গায়ে একটি সাদা থানের শাড়ি, মুখে কাঁচা পান চিবানোর লালচে দাগ।
​বৃদ্ধা ঘরে ঢুকেই সোজা আমার দিকে তাকালেন। তারপর হাতের লাঠিতে ভর দিয়ে ঘুরে ঘুরে ঘরে উপস্থিত একেকটা মুখের ওপর বেশ পরখ করে দৃষ্টি বোলাতে লাগলেন। তাঁর গলার স্বর বেশ কর্কশ হলেও তাতে এক অদ্ভুত মায়াবী টান ছিল—“বর কোনটা রে?”
​আমি ঈষৎ হেসে মতির দিকে হাত দেখিয়ে বললাম, “এই যে নানীজি, ইনিই আপনার নাতজামাই। বরের পাশে বসে আছি আমি।”
​নানীজি মুখের পানের পিসটি একপাশে ঠেলে দিয়ে মতিকে উপর থেকে নিচে কয়েকবার নিখুঁত চোখে দেখলেন। ঘেমে গিয়ে মতির চশমার কাঁচ ততক্ষণে ঝাপসা হয়ে উঠেছে। সে ভয়ে ভয়ে একগাল মেকি হাসি হাসার চেষ্টা করল।
​বৃদ্ধা চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করলেন, “বর কী করে?”
​আমি বেশ গর্বের সঙ্গেই বুক ফুলিয়ে উত্তর দিলাম, “বেসরকারি স্কুলে চাকরি করে নানীজি। খুব ভালো শিক্ষক। স্কুলের পোলাপান তারে মাথায় তুলে রাখে, এলাকার সবাই মান্য করে।”
​কথাটা শুনেই বৃদ্ধা এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়ালেন। ঘরের কোণে সলতে বাড়ানো হ্যারিকেনের আলোয় তাঁর মুখের শত বলিরেখা যেন মুহূর্তের মধ্যে আরও স্পষ্ট ও কঠিন হয়ে উঠল। তারপর এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে, উত্তরবঙ্গের খাঁটি আঞ্চলিক টানে বলে উঠলেন—
​“ওহ্! এলাও চাকরি হয় নাই?!”
​কথাটা বলেই তিনি এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে ঘুরে হনহন করে ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন।
​ঘরে উপবিষ্ট আমরা সবাই স্তম্ভিত। বর মতি হাঁ করে খোলা দরজার দিকে তাকিয়ে রইল, তার মুখের সেই মেকি হাসিটা এক সেকেন্ডে বাষ্প হয়ে উবে গেল। আমি চা-এর কাপে শেষ চুমুকটা দিয়ে কঠিন এক সামাজিক সত্য বুঝতে পারলাম—এ দেশে যে শিক্ষক দিনে বারো ঘণ্টা খেটে একটা পুরো প্রজন্মকে গড়ে তোলার পেছনে নিজের জীবন উৎসর্গ করে, সমাজভাবনায় তার কোনো অস্তিত্বই নেই! যতক্ষণ না পকেটে সরকারি স্কেল কিংবা সিলমোহরের ছাড়পত্র পড়ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তার সমস্ত অবদানই এক দীর্ঘস্থায়ী ‘সামাজিক বেকারত্ব’।
​আজ অনেক বছর পার হয়ে গেছে। কালস্রোতে মতির মাথার চুল কিছুটা পেকেছে, সে আজ সেই স্কুলেই একজন প্রবীণ ও পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষক। কত শত ছাত্র তার হাত ধরে জীবনের কেন্দ্রবিন্দু খুঁজে পেয়েছে! আমিও সরকারি কলেজের অধ্যাপনা শেষ করে অবসরে এসেছি। কিন্তু আজও কোনো বৃষ্টিভেজা বিকেলে চায়ের কাপ হাতে নিলে সেই বৃদ্ধার তীক্ষ্ণ মুখখানা চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
​মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে সময়কে পেছনে ঠেলে সেই বৃদ্ধার সামনে গিয়ে আরেকবার দাঁড়ায়। দুটো হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলি—“নানীজি, জীবনটা তো কেটে গেল মানুষ গড়ে, কিন্তু আপনাদের এই হিসাবের সমাজটার কাছে আজও আমাদের চাকরিটা আর হলো না!”
​বাইরে বৃষ্টি এখন আরও মুষলধারে নামছে। চালের ওপর পানি পড়ার রিমঝিম শব্দটা শুনতে দারুণ লাগছে। হুমায়ূন সাহেবের মতো করে আবার বললে—বৃষ্টির রাতে মানুষের অতীত নিয়ে একটু বেশিই ভাবতে ইচ্ছে করে। কারণ জল পড়ার এই একঘেয়ে শব্দগুলো হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিগুলোকে ঝালাই করার জন্য বড় বেশি দরকারি।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর
All rights reserved © 2019
Design By Raytahost